চর্বি ছাড়া গোশত খান
কুরবানি ঈদে গোশত তো খাওয়া হবেই। খাওয়া না কমিয়ে যদি কাটা ও রান্নার মাধ্যমেই কমিয়ে ফেলা যায় চর্বির ভাগটা! কীভাবে? জানিয়েছেন রান্নাবিদ রাহিমা সুলতানা রিতা। সাধারণত গোশত কাটা হয় কিউব আকারে। এভাবে কাটলে গোশতের মধ্যে চর্বির স্তরগুলো থেকেই যায়। এ জন্য গোশতের টুকরাগুলো স্তরে স্তরে কেটে চর্বির অংশটুকু বাদ দিন। সিনা, রান যেকোনো অংশ থেকেই এভাবে চর্বি বাদ দিয়ে শুধু লাল গোশতটুকু রাখা যেতে পারে। যাদের কোলেস্টেরলে সমস্যা রয়েছে, তাঁরা গোশত প্রথমে সেদ্ধ করে পানিটুকু ফেলে দিন। এরপর ইচ্ছামাফিক রান্না করুন। এতেও চলে যাবে অনেকখানি চর্বি। গ্রিল করা গোশতে চর্বি প্রায় থাকেই না বলা যায়। রোস্ট বা অন্য কোনোভাবে রান্না না করে তাই গ্রিল খাওয়া অনেক স্বাস্থ্যকর। সাদা সিরকা, লেবুর রস ও লবণ মাখিয়ে কাঁচা গোশত ভিজিয়ে রাখুন সারা রাত। এভাবে রাখলে গোশতের প্রায় ৮০ শতাংশই চর্বিই চলে যায়। এরপর তা সংরণ করা যেতে পারে অথবা রান্না করতে পারেন আপনার পছন্দমতো। পশুর চামড়া ছাড়াতে যতœ চাই বছর ঘুরে আবারও এল কুরবানির ঈদ। মানুষ কুরবানির পশু বেচাকেনায় ব্যস্ত।
প্রতিবছর কুরবানির পর পশুর চামড়া রণাবেণ ও বেচাকেনা নিয়ে আপনি পড়েন নানা ঝামেলায়। অথচ কুরবানির আগে ও পরে কিছু বিষয়ের প্রতি যদি ল রাখেন, তাহলে এই ঝামেলা এড়িয়ে যাওয়া যায় সহজেই। সেই সঙ্গে বেড়ে যায় আপনার দানকৃত চামড়ার বিক্রির টাকার পরিমাণ। পশু চামড়ার গুণগত মানের ওপর নির্ভর করে আমাদের দেশে চামড়া ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত আট ভাগে চামড়ার মান মূল্যায়ন করে থাকে। ‘এ’ ভাগকে সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করে সর্বনিমূল্যায়ন করা হয় এইচ ভাগকে। কীভাবে রা করবেন আপনার কুরবানির পশুর চামড়ার মান, এবার এ নিয়েই থাকছে কিছু টিপস। আর এসব টিপস দিয়ে সহায়তা করেছেন ল্যান্ডমার্ক ফুটওয়্যার লিমিটেডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন লিটন ও আবু রায়হান শরিফ। চামড়ার মান রা সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে চামড়ার তি ও গুণগত মান নষ্ট হয়ে থাকে। ব্যাকটেরিয়ার হাত থেকে পশুর চামড়াকে রা করতে বর্তমান বিশ্বে সাধারণত ড্রাই ট্রিটমেন্ট, সল্ট ট্রিটমেন্ট ও ফ্রিজিং করে চামড়া সংরণ করা হয়। উন্নত দেশগুলোতে চামড়া সংরণে ড্রাই ট্রিটমেন্ট ও ফ্রিজিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হলেও তা ব্যয় ও সময়সাপে বলে আমাদের দেশে সল্ট ট্রিটমেন্ট বা লবণ দিয়ে চামড়া সংরণ করা হয়। কুরবানির আগে ও পরে কিছু বিষয়ের প্রতি ল রাখলেই অতিসহজে চামড়ার গুণগত মান রা করতে পারবেন। কুরবানির আগে : অনেকেরই ধারণা, কুরবানির গরুটির গায়ের রঙের ওপরই হয়তো নির্ভর করে এর চামড়ার দাম। আর তাই কালো অথবা লাল গরুটির দাম কিছুটা চড়িয়েই হাঁকেন বিক্রেতা। * পশু কেনার সময় ল রাখতে হবে, আগে থেকেই গরুর চামড়ায় কোনো গভীর তচিহ্ন বা দাগ যেন না থাকে। * কুরবানির অনেক আগেভাগেই যদি পশু কিনে থাকেন তাহলে পশুর বাসস্থান হিসেবে এমন কোনো স্থান নির্বাচন করুন যেখানে পশুর গায়ে আঁচড় বা ত হবে না। পশুর থাকার জায়গায় খড় বা চট বিছিয়ে দিন। * পশু বাঁধা ও কুরবানির কাজে পাটের রশি ব্যবহার করুন। নাইলন বা প্লাস্টিকের দড়ি, লোহার শিকল পরিহার করুন। ঈদের দিন সকাল থেকেই পশুকে শক্ত খাবার (খড়, ভুসি, কাঁচা ঘাস ইত্যাদি) দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। বেশি করে পরিষ্কার পানি, ভাতের মাড় ইত্যাদি তরল খাবার খাওয়াতে পারেন। এতে কুরবানির পর পশুর চামড়া ছাড়ানো অনেক সহজ হবে। * পশু কুরবানির স্থান হিসেবে সমতল জায়গা বেছে নিন। এ েেত্র এবড়ো থেবড়ো রাস্তা ও কংক্রিটের মেঝে পরিহার করুন। * কুরবানির কাজে অপোকৃত দ লোক ঠিক করতে হবে। আনাড়ি লোক দিয়ে চামড়া ছাড়াতে গেলে চামড়া কেটে যেতে পারে। * কুরবানির জন্য শোয়ানো অবস্থায় পশুটিকে যেন টানাহেঁচড়া না করা হয় সেদিকে ল রাখতে হবে। * কুরবানির পশু জবাই করার কাজে বড় ও চামড়া ছাড়ানোর কাজে ধারালো মাথা ভোঁতা ছুরি ব্যবহার করতে হবে। * কুরবানির কাজে ব্যবহৃত বাঁশ বা লাঠি যেন মসৃণ হয় সেদিকে ল রাখা জরুরি। * সঠিক নিয়মে কুরবানির পশু শোয়ানো হলে সাধারণত চামড়া অত থাকে। কুরবানির পরে : কুরবানির চামড়ার গ্রেডিং ঠিক রাখতে হলে কুরবানির পর চামড়া ছাড়ানোর জন্য কিছু নির্দিষ্ট দিকে ল রাখা উচিত। এ ছাড়া চামড়া ছাড়ানোর পরে হাতেগোনা কিছু আনুষঙ্গিক কাজ করলে চামড়ার মান অুণœ থাকে। * চামড়া ছাড়ানোর সময় তাড়াহুড়ো করা ঠিক নয়। কুরবানি ও চামড়া ছাড়ানোর কাজ অভিজ্ঞ লোকজন দিয়ে করুন। * চামড়া ছাড়ানোর পর দ্রুত চামড়ায় লেগে থাকা রক্ত, চর্বি ও গোশতকণা সরিয়ে ফেলতে হবে। কেননা রক্ত-গোশত লেগে থাকা চামড়ায় ব্যাকটেরিয়া দ্রুত আক্রমণ করতে পারে। * চামড়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেয়ার সময় টেনেহিঁচড়ে নেবেন না। চামড়া যানবাহনে তোলার সময় সাবধানতা অবলম্বন করুন। * চামড়া দ্রুত বিক্রি করতে না চাইলে লবণ দিয়ে চামড়াটি ছড়িয়ে রাখতে হবে। * সাধারণত চামড়ায় ওজনের ২০ শতাংশ হারে লবণ ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ একটি মাঝারি আকারের গরুর চামড়ার ওজন ১৫ থেকে ২০ কেজি হলে লবণ ব্যবহার করতে হবে তিন থেকে চার কেজি। * প্রতিবছর কুরবানির আগে ‘বাংলাদেশ লেদার ম্যানুফ্যাকচার অ্যান্ড গুডস এসোসিয়েশন’ চামড়া কেনার একটি নির্দিষ্ট দাম ঘোষণা করে। সেদিকে ল রাখলে চামড়া ক্রয়-বিক্রয় করার সময় লোকসান হওয়ার আশঙ্কা অনেক কমে যায়। * ঢাকার বাইরে থেকে চামড়া এনে বিক্রি করতে হলে অবশ্যই সল্ট ট্রিটমেন্ট (লবণ ব্যবহার) করে আনতে হবে। * চামড়াকে পোকামাকড়ের হাত থেকে রা করতে হলে নেপথলিন ব্যবহার করা যেতে পারে। উপরোল্লিখিত টিপস সঠিকভাবে মেনে চললে চামড়ার গুণগত মান যেমন থাকবে, তেমনই প্রত্যাশিতভাবে পাওয়া যাবে চামড়ার দাম। সেই সঙ্গে উন্নত হবে দেশের চামড়া শিল্প। কেননা আমাদের দেশের ট্যানারিগুলো তাদের সারা বছরের প্রয়োজনীয় চামড়ার ৮০ শতাংশ সংগ্রহ করে থাকে কুরবানির ঈদের সময়। গোশতের সঠিক সংরণ পদ্ধতি কুরবানির ঈদে গোশতের সরবরাহ থাকে প্রচুর। তৈরি করা যায় বিভিন্ন স্বাদের ও বিভিন্ন ঢঙের গোশতের আইটেম। গোশত প্রাণিজ প্রোটিনের খুব ভালো উৎস। কাজেই সঠিকভাবে সংরণ করা প্রয়োজন। ডায়েট কাউন্সেলিং সেন্টারের পুষ্টিবিজ্ঞানী সৈয়দা শারমিন আখতার গোশত সংরণের বিষয়ে বলেন, সংরণের সময় সর্বপ্রথম মনে রাখতে হবে ঠিকমতো তা প্যাকিং হয়েছে কি না। হাড়সহ গোশত, হাড় ছাড়া গোশত, চর্বিসহ গোশত, চর্বি ছাড়া গোশত-এই প্রতিটি প্যাক হবে আলাদা। এরপর এই পলিথিনের প্যাকেটগুলো ডিপ ফ্রিজে (শূন্যের নিচে তাপমাত্রায়) রাখতে হবে। মাংস সংরণের আরো একটি পদ্ধতি হলো হালকা লবণ ও হলুদ দিয়ে মাংসগুলোকে তাপ দিলে তা অনেক দিন সাধারণ তাপমাত্রায়ই রাখা যায়। আবার ভিনেগার দিয়েও গোশত সংরণ করা যায়। কোনো টিন বা বোতলে ভিনেগারে গোশত সম্পূর্ণভাবে ডুবিয়ে রাখলে গোশত ভালো থাকে অনেক দিন। আর ভিনেগার যদি না পাওয়া যায়, তাহলে তার বদলে লেবুর রস ব্যবহার করা যেতে পারে। গোশতের টুকরোগুলোকে লেবুর রস দিয়ে মাখিয়ে ক্যানড করলে গোশত ভালো থাকে অনেক দিন। ভিনেগার বা লেবুর রস ব্যবহার করলে গোশত সংরণের পাত্রটি ডিপ ফ্রিজে না রেখে রেফ্রিজারেটরে সাধারণ তাপমাত্রায় রাখতে হবে। গোশত সংরণের সবচেয়ে আদি পদ্ধতি হলো গোশত রোদে শুকিয়ে নেয়া। হালকা লবণ দিয়ে মাখিয়ে নিয়ে রোদে ভালোভাবে শুকালে এই গোশত ভালো থাকে অনেক দিন। তবে শুকানোর পর অবশ্যই গোশতগুলো টিনে ভালো করে এঁটে রাখতে হবে, নয়তো পোকামাকড়ের আক্রমণে তার আবার পুষ্টি অপচয় হবে। কুরবানি ঈদের টিপস কুরবানির ঈদে আনন্দের পাশাপাশি থাকে কিছু বাড়তি দায়িত্ব। যেমন-পশু কেনা, কুরবানি দেওয়া, ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করাসহ নানা ঝামেলা। কিছু বিষয় আগে থেকে জানা থাকলে এসব ঝামেলার অনেকটাই এড়ানো যায় সহজে। তাই আপনাদের জন্য থাকছে বেশ কিছু কার্যকর টিপস। পরামর্শ দিয়েছেন কৃষি অধিদপ্তরের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. আবদুল বাকী। * কুরবানির পশু কিনতে যাওয়ার সময় পশু বিষয়ে অভিজ্ঞ কাউকে সঙ্গে নিতে পারলে ভালো, তিনি পশু চিনে কিনতে পারেন। * হাট থেকে পশু বাড়িতে আনার জন্য একজন শক্তসমর্থ লোককে সঙ্গে নিন, যিনি পশু বাড়িতে আনতে সাহায্য করতে পারবেন। * হাটে যাওয়ার সময় টাকা-পয়সা সাবধানে রাখবেন। * পশু কিনতে যাওয়ার সময় ভালো পোশাক না পরাই ভালো। দাগ বা ময়লা লাগার আশঙ্কাই বেশি। * হাতে সময় নিয়ে পশুর হাটে যাওয়া উচিত। এতে ধীরে সুস্থে, দেখে-শুনে পশু কিনতে পারবেন। * খাজনার (হাসিল) হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য হাটের বাইরে থেকে পশু কিনবেন না। এতে লাভবান হওয়ার চেয়ে চোরাই পশু কেনার আশঙ্কা থাকে বেশি। * হাটের খাজনা ঠিকমতো পরিশোধ করুন। * পশুর বয়স সম্পর্কে জেনে নিন। কেননা গরু দুই বছর এবং ছাগলের ন্যূনতম বয়স ছয় মাস না হলে কুরবানি আদায় হবে না। * বাহ্যিকভাবে দেখতে সুস্থ-সবল, নীরোগ পশু কিনুন। রোগবালাই আছে কি না দেখে নিন। * চামড়ায় কাটা ত দেখে নিতে হবে। দেখতে হবে কান কাটা, শিং ভাঙা, লেজ কাটা, খুরের মধ্যে ত বা জিহ্বায় ঘা আছে কি না। * পশুর মুখের সামনে খাবার ধরলে যদি জিহ্বা দিয়ে টেনে নেয় এবং নাকের ওপরটা ভেজা ভেজা থাকে তাহলে বুঝতে হবে গরু সুস্থ। অসুস্থ পশু খাবার খেতে চায় না। * গাভি বা বকনা গরু না কেনাই ভালো। নিতান্তই কিনতে হলে পশুচিকিৎসকের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে পশুটি গর্ভবতী কি না। গর্ভবতী পশু কুরবানি হয় না। * গরুর কুঁজ মোটা টানটান হলে গরু সতেজ, সুস্থ হয়। * পশু কিনেই হাট থেকে পশুর জন্য খাবার কিনে ফেলুন। * হাট থেকে পশু আনার সময় পাটের দড়ি দিয়ে পশুকে ভালোভাবে বেঁধে আনুন। না হলে পশু গাড়ির শব্দে ভয় পেয়ে দৌড় দিতে পারে। * কুরবানির আগেই কসাই ঠিক করে রাখুন, না হলে ঝামেলা পোহাতে হতে পারে। * গোশত কেটে রাখার জন্য পরিষ্কার চাটাই সংগ্রহে রাখুন। * কুরবানিতে ব্যবহারের জন্য ছুরি, দা, বঁটিতে ধার দিয়ে রাখুন। * কুরবানির গোশত সমভাবে বণ্টনের জন্য আগে থেকে দাঁড়িপাল্লা জোগাড় করে রাখুন। * মাটিতে পড়ে থাকা পশুর রক্তে ছিটানোর জন্য ব্লিচিং কিনে রাখুন। * জবাই করার আগে পশুকে ভালোভাবে গোসল করাতে হবে এবং প্রচুর পরিমাণে পানি খাওয়াতে হবে। এতে চামড়া ছাড়ানো সহজ হয়। * পশু মাটিতে শোয়ানোর সময় ল করতে হবে দেহে যেন কোনো প্রকার চোট না লাগে। এতে চামড়া থেঁতলে অথবা ছিড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। * চামড়া ছাড়ানোর জন্য মাথা বাঁকানো অর্থাৎ ইংরেজি ‘ইউ’ অর আকারের ছুরি ব্যবহার করতে হবে। * কুরবানির পশু বাড়ির পাশে ফাঁকা জায়গায় জবাই করুন। * জবাই করার পর রক্ত, মলমূত্র, হাড়, বর্জ্য ইত্যাদি যেখানে-সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখবেন না। এতে পরিবেশ দূষিত হবে। * পশুর রক্ত ও বর্জ্য মাটির গর্তে পুঁতে ফেলুন। * রক্ত ছড়িয়ে থাকা স্থানে পানি দিয়ে ধুয়ে ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে দিন। সূত্র : ইন্টারনেট